প্রাণী রাজ্য

Animals Life in Bengali Description

Showing posts with label ভালুক(Bear). Show all posts
Showing posts with label ভালুক(Bear). Show all posts

গেছ-ভাল্লুক

দেখতে ভাল্লুকেরমত তাই হয়ত এর নাম গেছ-ভাল্লুক (Binturong), তবে লম্বা লেজ আছে। গায়ের রঙ্গ কালচে, বড় লোমে ঢাকা। লেজ লম্বা শরীরের সমান। শরীরের মাপ ৯০ সেমি. লেজের মাপ ৯০ সেমি. পর্যন্ত হয়। ওজন ২০ থেকে ২২ কেজি হয় ।

গেছ-ভাল্লুক মূলত বৃক্ষচারী। এরা গাছে থাকতে পছন্দ করে তবে মাটিতেও চলাফেরা করে। গেছ-ভাল্লুক এক গাছের ডাল থেকে অন্য গাছের ডালে লাফিয়ে যেতে পারে। এরা বিভিন্ন বুন ফল, ইঁদুর জাতীয় প্রাণী, পাখি – পাখির ডিম, পোকামাকড় খায়।

বাংলাদেশের সিলেট ও চট্রগ্রামের পাহাড়ি চিরসবুজ বনে গেছ-ভাল্লুকের বাস। গেছ-ভাল্লুক দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। অবৈধ শিকার, আবাস্থল ধ্বংসের ফলে গেছ-ভাল্লুক আজ অতি বিপন্নর তালিকায়। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষা করতে না পারলে আমরা হারাব আমাদের প্রাকৃতিক প্রতিবেশীকে।

লেখা – ঋজু আজম

কালো ভালুক

এশীয় কালো ভালুক হিমালয়ের বনাঞ্চলেও পাওয়া যায়। ভালুকের সবগুলো প্রজাতির মধ্যে কালো ভালুক (Black bear) মধ্যম আকারের। এরা চন্দ্র-ভালুক ও সাদা বুকের ভালুক নামেও সুখ্যাত। বৈজ্ঞানিক নাম Ursus thibetanus । দক্ষিণ এশিয়া, কোরিয়া, চীনের উত্তরাঞ্চল, পূর্ব রাশিয়া ও জাপানের কিছু অংশেও এই ভালুকের দেখা যায়। মন খারাপ হওয়া তথ্য হলো, পৃথিবী থেকে দিন দিন এই ভালুকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। কালো ভালুক বদমেজাজি, কোনও প্রকার পূর্বাভাস ছাড়াই হঠাৎ আক্রমণ করে বসে। ভালুকবিদ রুডিয়ার্ড কিপলিং বলেছেন, ‘ভালুক প্রজাতির মধ্যে কালো ভালুক বড়ই অদ্ভূত প্রাণী।’ কিপলিংই প্রথম কালো ভালুক নিয়ে গবেষণা করেন।

ভাল্লুক

বাংলাদেশে তিন প্রজাতির ভালুক আছে। এগুলি হচ্ছে কাল ভালুক (Selenarctos thibetanus), শ্লথ ভালুক (melursus ursinus)এবং মালয়ান ভালুক (Helaratos malayamis)। কাল ভালুক সাধারনত কাল ও বাদামী রং মেশানো আর শ্লথ ভালুক দেখতে মিশমিশে কালো। মালয়ান ভালুক বেশ বিরল। সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে প্রচুর ভালুক আছে। একটি কাল ভালুক ২০০ কেজি পর্যন্ত ওজনের হয়ে থাকে। ভূমি থেকে কাঁধের উচ্চতা প্রায় তিনফুট, দৈর্ঘ্য প্রায় ছয়ফুট। তবে Male ভালুক Female ভালুকের চেয়ে ওজনে অনেক ভারী হয়। এদের বুকে অর্ধচন্দ্রের মত একটি সাদা দাগ রয়েছে। সব ভালুকই পিঁপড়া, উঁইপোকা এবং মৌমাছি খেতে পছন্দ করে। বেশী ক্ষুধার্ত ভালুক মরা যে কোন প্রাণিই খেতে পারে। বিভিন্ন গাছের ফল ওদের খুবই প্রিয়। মাঝে পাহাড়ি নালা/ছড়া থেকে মাঝে মাছও খেয়ে থাকে।
ভালুক নিশাচর প্রাণি। তবে মানুষর উপদ্রবহীন জায়গা অথবা গভীর বনে দিনেও খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। সাধারণত গোধুলীর সাথে সাথে ভালুক খাবারে খেতে বের হয়। সারা রাত ধরে খাদ্যের সন্ধানে ঘুরে বেড়াবে আর ভোর হলে কোন গুহা বা পাথরের ফাঁকে গা এলিয়ে দিয়ে আরাম করে ঘুমাবে।
পারতপক্ষে ভালুক মানুষ মারে না। তবে কখনো মানুষ যদি আচমকা ওদের সামনা সামনি হয়ে পড়ে তখন নিজে আক্রান্ত হ্ওরয়ার ভয়ে মানুষকে আক্রমণ করে। মানুষের শরীর ছিন্ন ভিন্ন করে দেয় ভালুকের ধারালো নখের আঘাতে আঘাতে। ভালুক কানে কম শুনে আর দিনের বেলায় চোখে কম দেখে। তবে ভালুকের শ্রবণশক্তি অত্যন্ত প্রখর। শীতের শেষে মা ভালুক একটি বাচ্চা প্রসব করে। কোন ঘন জংগলে, গুহায় অথবা গাছের বড় ফোকরে বাচ্চা লুকিয়ে রাখে। বাচ্চা একটু বড় হলেই মা ভালুক বাচ্চাকে সাথে নিয়ে বনে ঘুরে বেড়ায়। বাচ্চাসহ মা ভালুক মানুষের সামনে পড়া মাত্রই আক্রমণ নিশ্চিত। ভালুক খুব ভাল গাছে চড়তে পারে। সুতরাং গভীর বনে হাটার সময় খুব সাবধান। ভালুক অনেক ক্ষেত্রে মানুষের বন্ধুও হতে পারে। কিন্তু বন্য ভালুকগুলো? এগুলো এতটাই বিপজ্জনক যে, ভয়ঙ্কর প্রাণীর তালিকার মধ্যে এদের স্থান ১০ম। ভালুক দ্বারা বছরে প্রায় ৫-১০টি দুর্ঘটনা ঘটে।

লাল পান্ডা

লাল পান্ডা প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৮২১ সালে। অথচ জায়ান্ট পান্ডা আবিষ্কৃত হয় এর ৪৮ বৎসর পরে ১৮৬৯ সালে।বনের ভিতর মানুষের অবাধ যাতায়াতের কারণে এদের অবস্থা ধীরে ধীরে সঙ্গীন হয়ে উঠেছে। যার জন্য এদের নাম বিপন্ন প্রজাতির খাতায় উঠে গেছে।নেপাল ও চীনের দক্ষিণ প্রান্তের বনে এই লাল পান্ডার বাস। এদের নামকরণ করা হয়েছে নেপালি ভাষায়। নেপালি ভাষায় "nigalya ponya" শব্দের অর্থ যেসব প্রাণী বাঁশ এবং বিভিন্ন ধরণের গাছ খায় আর চীনাভাষায় এদের নাম Hunho অথবা Firefox, গায়ের রং এবং আকারের জন্য এদের এরকম নাম হয়েছে। ইংলিশ নাম Shining cat বা The Red Panda । খুব জোরে জোরে চীৎকার করে বলে এদেরকে সহজেই দেখা যায়। এরা সম্পূর্ণরূপে উদ্ভিদভোজী। লাল পান্ডা তাদের শরীরের ওজনের ৪৫ ভাগেরও বেশি ওজনের খাবার খেয়ে থাকে। দিনে প্রায় ২০০,০০০টি বাঁশের পাতা এরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। এদের কথা প্রথম লিখিত অবস্থায় পাওয়া যায় ১৩শ শতকের ছৌ রাজবংশের সময়।



এরা রেকুন প্রজাতির প্রাণী। দেখতেও প্রায় রেকুনের মত। লাল পান্ডা বেশ লাজুক এবং শান্ত। দিনের বেশিরভাগ সময় গাছের ডালে ঘুমিয়ে কাটায়। সমস্ত শরীর লালচে রঙের ফার দিয়ে মোড়ানো।
আকারে গৃহপালিত বিড়ালের চেয়ে একটু বড়। ওজন প্রায় ৪-৬ কেজি।
এদের শরীরের প্রধান রং বাদামী, পেট, গলা ও বাহুগুলো কালো রঙের। মাথা, মুখ, চোখ ও হাত-পায়ের সম্মুখভাগ সাদা রঙের। জায়ান্ট পান্ডার মত এদের অতিরিক্ত একটা বৃদ্ধাঙ্গুলি আছে। এটা আসলে কোন আঙ্গুল নয়, শরীরের একটা হাড়ের বর্ধিতাংশ মাত্র।আয়ু প্রায় ১২-১৪ বৎসর।
এরা প্রধানত: বাঁশ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এছাড়াও বিভিন্ন রকমের ফল, গাছের শিকড় এবং মাঝেমধ্যে পাখির ডিম এবং ছানা খেয়ে থাকে।
১-৪ বৎসরের মধ্যে স্ত্রীপ্রজাতির লাল পান্ডা বাচ্চা প্রসব করে। এদের গর্ভধারণকাল ১১২-১৫৮ দিন। একবারে এরা তিনটার বেশি বাচ্চা প্রসব করে।
এরা সাধারণত সকাল এবং অপরাহ্নে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এই সময় তারা খাবার খেয়ে থাকে। আর দিনের অন্যান্য সময় ঘুমিয়ে কাটায়। এরা সাধারণত একা থাকে। তবে প্রজননকালে জোড়া বাঁধে।
এই Red Panda বা লালপান্ডা'র বৈজ্ঞানিক নাম Ailurus fulgens ।

পান্ডা

পাণ্ডা এক প্রকারের ভাল্লুক। ভাল্লুক মাংসাশী প্রাণী হলে পাণ্ডা সম্পূর্ণ তৃণভোজী প্রাণী। পাণ্ডাদের বসবাস চীনে এবং সেখানকার এক প্রকার বাঁশ মানে ঘাস (বাঁশ এক প্রকার ঘাস) খেয়ে বেঁচে থাকে।
পান্ডা ভালুকের মতো দেখতে সাদা-কালো প্রাণী। দুই প্রকারের পান্ডা আছে জায়ান্ট ও লাল পান্ডা। এরা পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব চীনের পাহাড়ি ঢালের বাঁশপূর্ন জঙ্গলে বাস করে। শ্বাপদকূলের অন্তর্গত হলেও এর খাদ্য কেবল বাঁশ পাতা।
বাঁশের কঞ্চি ধরার জন্য জায়ান্ট পান্ডার পাঁচটি সাধারণ আঙুল ছাড়াও হাতের তালু ও কব্জির সংযোগস্থলে একটি বুড়ো-আঙুলের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের) মত অংশ দেখা যায়। এটি আঙুল নয়। পান্ডার একার জন্য ভগবানের দানও নয়। বর্ধিত রেডিয়াল সিসাময়েড অস্থি মাত্র-- যা জায়ান্ট পান্ডার নিকট আত্মীয় (উরসিডে পরিবার)-- লাল পান্ডা ও ভালুকেরও খানিকটা বড়, তবে এতটা না।
এরা যে শ্বাপদ এবং বাঁশ পাতা খাওয়ার জন্য পুরোপুরি বিবর্তিত নয় তার অন্যতম প্রমাণ এদের খাদ্যনালী। তৃণভোজী প্রাণীদের খাদ্যনালী লম্বা হয় এবং পাকস্থলীর আগে অথবা বৃহদান্ত্রের সিকাম বা কোলনে আঁশ(fibre) গেঁজিয়ে পাচন সম্পূর্ণ করার ব্যবস্থা থাকে। পান্ডার এর কোনটাই নেই। আছে শুধু অন্যান্য শ্বাপদদের মত কেবল ছোট (নাতিদীর্ঘ) ক্ষুদ্রান্ত্র। তাই খুব বেশী পরিমাণ (বাঁশ পাতা) খেতে হয়। বাঁশগাছ ছেড়ে নামার পর্যন্ত সময় পায়না।
পাণ্ডা বলতে গেলে বাঁশ পাতা আর কঞ্চি ছাড়া কিছুই খায় না। মাঝে-মধ্যে শাকসবজি, মাছ বা অন্য ছোট প্রাণী খেলেও এদের খাবারের নিরানব্বই শতাংশই বাঁশ। পাণ্ডা খুব দ্রুত খায়, প্রচুর পরিমাণে খায় আর এতে তারা সময় ব্যয় করে দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা। এর কারণ_ এরা যে পরিমাণ খাবার খায় তার কেবল পাঁচ ভাগ খাবার হজম হয়। আবার বাঁশ খুব পুষ্টিকর খাবারও নয়। তবে বাঁশ গাছের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ হলো এর পাতা এবং কচি কঞ্চিগুলো আহারের সময় তাই এ দিকেই বেশি মনোনিবেশ করে। তাই শরীর ঠিক রাখার জন্য তাদের অনেক খেতে হয়। ১২ ঘণ্টায় তাদের শরীরের ১৫ শতাংশ ওজন বেড়ে যায়। তাই তারা দ্রুত খায়। পাণ্ডার মাড়ির দাঁত বেশ বড় আর চ্যাপ্টা। দাঁতের এ ধরনের গঠন তাদের বাঁশ পাতা, কঞ্চি বা কচি কাণ্ড টেকে আনতে সাহায্য করে। বাঁশ পাতা মুখের কাছে আনার জন্য তারা সামনের পা দিয়ে কাণ্ড আঁকড়ে ধরে, তারপর পাতা নিচে নেমে এলে মুখ দিয়ে তা ছিঁড়ে নেয়। বাঁশ গাছের অনেক ধরনের প্রজাতি রয়েছে। বর্তমানে পাণ্ডাদের আবাসস্থলে অল্প কয়েক ধরনের বাঁশ জন্মে। পাণ্ডা যেখানে বাস করে সেখানে কম করে হলেও অন্তত দুই প্রজাতির বাঁশ থাকতে হয়, অন্যথায় তাদের ক্ষুধার্ত থাকতে হয়। পাণ্ডা পাহাড়ি অঞ্চলে খাবারের খোঁজে অতি সহজেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ পাহাড়ি উপত্যকা এখন জনবসতিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। আর পাণ্ডা খুব লাজুক প্রাণী, তারা কখনো মানুষের আবাসস্থলের কাছেও যায় না। এতে পাণ্ডাদের এখন সীমিত গণ্ডিতে বসবাস করতে হচ্ছে। মানুষ এখন পাহাড়ের ঢালে গাছ কেটে চাষাবাদ শুরু করেছে, তাই পাণ্ডাদের আবাসস্থল দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। এদিকে নতুন আরেক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। পাণ্ডাদের আবাসস্থলের বাঁশগুলো যখন প্রাকৃতিকভাবেই মরে যায় তখন তারা খাবারের খোঁজে অন্য জায়গাতেও যেতে পারে না। এতে তাদের ভীষণ ক্ষুধার্তও থাকতে হয়। এ সময় অনেক পাণ্ডা মারাও যায়। ভাবতে অবাক লাগে, বিশ্বে আছেই মাত্র এক হাজারের মতো পাণ্ডা, তাদেরও আমরা ঠিকমতো বাঁচতে দিতে পারছি না। চীন সরকার এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা অবশ্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে পাণ্ডাদের সংরক্ষণ করার জন্য। বিজ্ঞানীরাও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের খাদ্যের নতুন উৎস খুঁজে বের করার জন্য। তবে সব কথার শেষ কথা, আমরা কখনো চাইব না তারা পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাক!

নাজমুল হক ইমন